Uncategorized

নবদ্বীপের বুকে রানি রাসমণির স্মৃতিবিজড়িত সেই কাছারি বাড়ি “এক হারানো অধ্যায়”

নদিয়ার রাজবংশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নবদ্বীপের এই প্রাচীন ইমারতটি। একসময় যেখান থেকে দাপটের সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করতেন স্বয়ং রানি রাসমণি, আজ সেই কাছারি বাড়িটি কালের সাক্ষী হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।

 

ঊনবিংশ শতকের শুরুর দিক। নদিয়ার রাজসিংহাসনে তখন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপৌত্র গিরীশচন্দ্র (১৮০২-১৮৪১)। তিনি জাগতিক রাজকার্য অপেক্ষা আধ্যাত্মিক জগতেই বেশি সময় ব্যয় করতেন। রাজার এই উদাসীনতায় রাজকোষে টান পড়ে, যার ফলে কোম্পানির প্রাপ্য খাজনা বাকি পড়ে যায়। শেষমেশ ঋণের দায়ে নদিয়া রাজের হাতছাড়া হয় ‘উখড়া পরগনা’। নিলামে সেই পরগনার উত্তর ভাগ (যার মধ্যে নবদ্বীপ ছিল) কিনে নেন কলকাতার জমিদার মধুসূদন সান্যাল এবং দক্ষিণ ভাগ যায় কাশীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে।

কিন্তু জমিদার মধুসূদন সান্যাল বেশিদিন এই সম্পত্তি ধরে রাখতে পারেননি। ১৮৫২ সালে তিনি জমিদারি বিক্রি করে দেন এবং তা কিনে নেন জানবাজারের রানি রাসমণি।

 

গিরীশচন্দ্রের মৃত্যুর পর ১৮৪১ সালে নদিয়ার সিংহাসনে বসেন রাজা শ্রীচন্দ্র। নদিয়ার রাজারা ঐতিহাসিকভাবে ‘নবদ্বীপাধিপতি’ উপাধি ব্যবহার করতেন। কিন্তু নবদ্বীপই যদি অন্যের দখলে থাকে, তবে এই উপাধি অর্থহীন। এই লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে শ্রীচন্দ্র মরিয়া হয়ে নবদ্বীপের জমিদারি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন, কিন্তু সফল হননি। নবদ্বীপের মালিকানা পাকাপাকিভাবে রানি রাসমণির হাতেই থেকে যায়।

 

জমিদারি কেনার পর প্রশাসনিক কাজকর্ম চালানোর জন্য রানি রাসমণি নবদ্বীপে একটি কাছারি বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সম্পাদক শান্তিরঞ্জন দেবের মতে, দেওয়ান কার্তিকেয় চন্দ্রের ‘ক্ষিতিশবংশাবলী চরিত’ গ্রন্থে এর বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায়।

কাছারি বাড়ির অবস্থান বর্তমানের গোকুলানন্দ ঘাট রোডে। শোনা যায়, রানি রাসমণি বা তাঁর জামাতা মথুরনাথ যখনই নবদ্বীপে আসতেন, বজরা থেকে সরাসরি এই বাড়িতে উঠতেন। কাছারি বাড়ির ভিতর থেকেই একটি সিড়ি সোজা নেমে গিয়েছিল গঙ্গার দিকে, যা এখন ‘ছাড়া গঙ্গা’ নামে পরিচিত। এই ঘাটটিই লোকমুখে ‘রানির ঘাট’ নামে প্রসিদ্ধ।

 

একসময়ের সরগরম এই কাছারি বাড়ি আজ অনেকটাই নিস্তব্ধ। আটের দশক পর্যন্ত এখানে দাপ্তরিক কাজকর্ম চলত, যার শেষ তদারককারী ছিলেন বৃন্দাবন গোস্বামী। বর্তমানে বাড়ির একাংশে ভাড়াটিয়ারা বসবাস করেন। তবে জরাজীর্ণ হলেও বাড়ির অভ্যন্তরে এখনও টিকে আছে রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠিত রাধাগোবিন্দ জিউ এবং গৌরাঙ্গ জিউর মন্দির।

বাম আমলে খাজনা প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর এই বাড়ির প্রশাসনিক গুরুত্ব কমে যায়। তবে ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে সম্প্রতি রানির ঘাট ও সংলগ্ন এলাকার সংস্কার করা হয়েছে এবং ঘাটে রানি রাসমণির একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। নবদ্বীপের ঐতিহ্যের এক নীরব সাক্ষী হিসেবে আজও টিকে আছে এই কাছারি বাড়ি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!