Uncategorized

আজ দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী-জাগ্রত বোল্লা কালী মায়ের বাৎসরিক মহাপুজো। সেই বিষয়ে বিশেষ প্রতিবেদন :-

‘বোল্লা রক্ষাকালী’ পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বিখ্যাত দেবী। এই দেবীর মন্দিরটি বালুরঘাট শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে বোল্লা গ্রামে অবস্থিত। দশম-একাদশ শতক থেকেই এখানে বোল্লা গ্রামে মায়ের পুজো হচ্ছে, এবং তখন তান্ত্রিক নির্মিত পঞ্চমুণ্ডি ছিল। বলা দরকার পালযুগে বরেন্দ্রভূমির অন্তর্গত ছিল এই ভূখণ্ড। এখানে তান্ত্রিক ধর্মের পুরোনো ঘাঁটি, এবং সেই সময়ে এখানে কোনো স্থানেশ্বরী অধিষ্ঠাত্রী মায়ের পুজো প্রচলিত ছিল এমন সিদ্ধান্ত কাজেই অস্বাভাবিক নয়। সেযুগে এখানে যে মায়ের পুজো প্রচলিত ছিল সেই মা বোল্লা কালী আজ রক্ষাকালী বলেই মূলত পরিচিত, এমনকী মড়কের সময় তিনি রক্ষা করেন এই বিশ্বাস আছে, প্রায় একশো বছর আগে ১৯২০ সালে মড়ক ঘটেছিল এই অঞ্চলে, এবং বোল্লা কালী মড়ক থেকে রক্ষা করেছিলেন বলে তাঁকে সেই সময় মড়কাকালী বলা হত।

 

মায়ের পুজোয় পঞ্চ দ্রব্যের ব্যাপক ব্যবহার (পঞ্চগুঁড়ি, পঞ্চশস্য, পঞ্চরত্ন, পঞ্চপল্লব প্রভৃতি) থেকে একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা যে পালযুগে হয়তো এখানে পঞ্চরক্ষিকা পুজো হত, ইনি পালযুগের রক্ষামাতৃকা ছিলেন। এ ছাড়া মহামারি থেকে রক্ষা করেন, এমন মাতৃকার উল্লেখও তন্ত্রগ্রন্থে আছে। তবে বোল্লা কালীর লিপিবদ্ধ নথিবদ্ধ ইতিহাস বেশি পুরোনো নয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় বর্ধমানের জমিদার হরিমোহন গাঙ্গুলি বোল্লা গ্রাম সহ এই তল্লাটের মালিকানা পান, সেই সময় মহা ধুমধামে কালীপুজো শুরু হয়। এই জমিদারের দুই নায়েব, ভ্রাতৃদ্বয় রামসিংহ এবং চিত্তগোবিন্দ চৌধুরী পরে জমিদার হন, এবং পুজোর দায়িত্ব নেন। সেই সময় জ্যৈষ্ঠমাসের ফলহারিণী অমাবস্যায় বার্ষিক কালীপুজো হত।

 

এরপর রাসপূর্ণিমার পরবর্তী শুক্রবার বার্ষিক পুজোর প্রথা শুরু হয়। শুক্রবার এখানে হাটবার ছিল বলে জানা যাচ্ছে এবং সম্ভবত রাসের মেলার সঙ্গে বোল্লা কালীর মেলাকে মিলিয়ে দেওয়ার একটা প্রয়াস ছিল। বার্ষিক পুজো ছাড়াও প্রতি সপ্তাহেই শুক্রবার মায়ের অন্নভোগ হয়। এ ছাড়া রোজই মায়ের নিত্যপুজো হয়। একটি কালো শিলাখণ্ডে মায়ের নিত্যপুজো হয়। বার্ষিক পুজোর আগে বিশাল মাতৃমূর্তি নির্মিত হয়। এই পুজো ঘিরে বিরাট মেলা বসে। আশেপাশে বালুরঘাটে ও গঙ্গারামপুরের হোটেলগুলো ভরতি হয়ে যায়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কালীভক্তরা আসেন। এখানে পাঁঠাবলির মানত করার পাশাপাশি মায়ের মূর্তি নির্মাণ করেও নিবেদন করা হয়। ২০১৯ এ দু-হাজার কালীমূর্তি নির্মাণ করে মায়ের পুজোয় নিবেদন করেন ভক্তরা। এই কালী মূর্তিগুলি মা বোল্লা কালীর বার্ষিক পুজোয় পূজিত মূল মূর্তির মতোই। মায়ের পুজোয় প্রসাদ হিসেবে কদমা বিখ্যাত, বৃহৎ আকৃতির দুই কিলোর কদমাও পাওয়া যায় এই সময়। মাকে বেশ কয়েক ভরি সোনার গয়না পরানো হয় পুজোর সময়।

 

স্থানীয় বিশ্বাস মা অতি জাগ্রত। ১৯২৩ সালে মায়ের মূর্তি তৈরি করার সময় শিল্পী নকড়ি মহান্ত মায়ের নাকের সামনে কেরোসিনের লম্ফ ধরে কাজ করছিলেন, রাতের বেলায়, মা সেই ধোঁয়ায় বিরক্ত হওয়ায় জ্বলন্ত লম্ফটি উড়ে গিয়ে হাটখোলায় অগ্নিকাণ্ড ঘটায়, এ-রকম একটি কিংবদন্তী আছে। “বোল্লা” নামের পেছনে কারণ হিসেবে বলা হয় চারশো বছর আগে বল্লভ চৌধুরী নামে একজন জমিদার এই কালীমূর্তি নির্মাণ করেন, ফলে বল্লভকালী, সেই থেকে বোল্লা কালী। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় যাঁরা নায়েব এবং পরে জমিদার হন, সেই চৌধুরী উপাধির বাবুদের সঙ্গে বল্লভ চৌধুরীর সম্পর্ক কিছু ছিল কি না, স্থির জানতে পারিনি, তবে অসম্ভব নয়। জমিদার থেকে অনেকেই নায়েবে পরিণত হতেন, এবং আবার নায়েব থেকেও জমিদার হওয়ার অনেক উদাহরণ আছে। বোল্লা নামের সঙ্গে বল্লাল কোনোভাবে যুক্ত থাকতে পারে কি না জানা নেই, যদিও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে শাক্ত রাজা বল্লালের স্মৃতিবিজড়িত মাতৃকা উপাসনাপীঠ আছে।

 

এখানে মায়ের রং আকাশী নীল অর্থাৎ শ্যামা। মায়ের মূর্তি চোদ্দো হাত লম্বা বলে জানতে পারছি দুয়েকটি বই থেকে, তবে একটি স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী বর্তমানে সাড়ে সাত হাত দীর্ঘ প্রতিমা তৈরি হয়। মা বোল্লা কালীর মন্দিরটির চূড়া বেশ দীর্ঘ চুরাশি ফুট উঁচু। এই পুজোয় ১০ হাজার পাঁঠাবলি দেওয়ার একটা রীতি আছে। এই রীতির বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। তবে মামলায় হস্তক্ষেপ করেনি আদালত।

 

*পথনির্দেশ*- বালুরঘাট স্টেশন থেকে বাস বা অটোয় যাওয়া যায় মা বোল্লা কালীর মন্দিরে। মল্লিকপুর স্টেশন থেকেও অটো বা রিকশায় যাওয়া যায় বোল্লা গ্রামে। বালুরঘাট শহর থেকে কুড়ি কিলোমিটার পূর্বে এই বোল্লা গ্রাম। কলকাতা থেকে বাস রাস্তায় সরাসরি সংযুক্ত।

 

*পুজোর_সময়*- কার্তিক মাসে রাস পূর্ণিমার পরের শুক্রবার। এই শুক্রবারটি অগ্রহায়ন মাসেও পড়তে পারে।।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!